স্নায়বিক পুনরুদ্ধারের চাবিকাঠি হিসেবে পুনর্বাসনের উপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন মেদান্তা।
গুয়াহাটির বাসিন্দা, তরুণ পেশাজীবী প্রাঞ্জলকে দেখে মনে হতো তিনি একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেন — তিনি কখনো ধূমপান করতেন না, মদ্যপান পরিহার করতেন এবং প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার জগিং করতেন। তবে, কাজ সামলানো এবং স্ট্রোক থেকে সেরে ওঠা তার বাবার যত্ন নিতে গিয়ে তিনি প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলেন। একদিন কর্মস্থলে হঠাৎ তার কথা বলতে অসুবিধা হয়, সাথে শরীরের ডান পাশে দুর্বলতা এবং মুখের ভাব বিকৃত হয়ে যায়। সহকর্মীরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান, যেখানে তার স্ট্রোক ধরা পড়ে। পরবর্তী পরীক্ষায় দেখা যায়, তার উচ্চ রক্তচাপ মারাত্মকভাবে অনিয়ন্ত্রিত ছিল — পারিবারিক স্ট্রোকের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না।
এক বছর পরেও প্রাঞ্জলকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সে কেবল অন্যের সাহায্যে হাঁটতে পারে, তার ডান হাতটি সচল নয় এবং তার কথা বলার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হওয়ায়, এই প্রভাব তাকে শুধু আবেগগতভাবেই নয়, আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
২০২৬ সালে নিউজউইক কর্তৃক ভারতের সেরা হাসপাতাল হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মেদান্তা- দ্য মেডিসিটিপ্রতিটি রোগীর প্রয়োজন অনুসারে একটি পূর্ণাঙ্গ স্নায়ু-পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রদান করে। ডাঃ জ্যোতি সেহগাল, ডিরেক্টর, মেদান্ত গুরুগ্রামের নিউরোলজিবলেছেন, অনেকে মনে করেন যে, রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল হলেই স্নায়বিক রোগের চিকিৎসা শেষ হয়ে যায়। বাস্তবে, প্রকৃত আরোগ্যলাভ শুরু হয় পুনর্বাসনের মাধ্যমে। সুসংগঠিত পুনর্বাসন মস্তিষ্ক ও শরীরকে হারিয়ে যাওয়া কার্যক্ষমতা পুনরায় শিখতে, নতুন সীমাবদ্ধতার সাথে মানিয়ে নিতে এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে সক্ষম করে। এই প্রক্রিয়া যত আগে এবং যত নিয়মিতভাবে শুরু হবে, ফলাফল তত ভালো হবে।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ-এর মতে, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১৮ লক্ষ নতুন স্ট্রোকের ঘটনা ঘটে এবং বিশেষ করে উত্তর-পূর্বের মতো অঞ্চলে স্নায়বিক রোগের প্রকোপও বাড়ছে। সুস্থ হয়ে ওঠার সময়কাল ভিন্ন ভিন্ন হয় — স্ট্রোক এবং আঘাতপ্রাপ্ত রোগীরা কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠতে পারলেও, পারকিনসন্স এবং আলঝেইমার্সের মতো রোগের জন্য নিরন্তর চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
পুনর্বাসন একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যার মধ্যে ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত। স্নায়বিক আঘাতের ধরন ও তীব্রতা, কার্যক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, জীবনযাত্রার চাহিদা এবং আরোগ্যের লক্ষ্য বিবেচনা করে এই কর্মসূচিগুলো অবশ্যই প্রতিটি রোগীর জন্য যত্নসহকারে তৈরি করতে হবে। একটি ব্যক্তিগতকৃত পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে থেরাপির লক্ষ্য শুধু নড়াচড়াই নয়, বরং কথা বলা, বোধশক্তি এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম ও কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসার সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা আরোগ্যকে আরও অর্থবহ ও টেকসই করে তোলে।
পারিবারিক সমর্থনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডঃ সেহগাল বলেছেন, সঠিক যত্ন, সুসংগঠিত পুনর্বাসন এবং শক্তিশালী সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক রোগী স্বাধীনতা ফিরে পেতে এবং অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন। যেহেতু আরোগ্যলাভ একটি দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া যার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তাই পুরো পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ এর ফলাফলকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, শুধু স্ট্রোক প্রতিরোধের জন্যই নয়, বরং বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের জটিলতা কমানোর জন্যও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য।
ডাঃ সেহগাল আরও উল্লেখ করেছেন যে, একটি সাধারণ ভুল ধারণাও রয়েছে যে স্নায়বিক রোগ থেকে সেরে ওঠা কেবল প্রথম কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই ঘটে। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, প্রকৃতপক্ষে, নিউরোপ্লাস্টিসিটি নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্কের নিরাময় ও অভিযোজনের এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এমনকি কোনো রোগী কয়েক মাস বা বছর পরেও চিকিৎসা নিলেও সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। ধারাবাহিক উদ্দীপনা এবং সুসংগঠিত পুনর্বাসনের মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র সময়ের সাথে সাথে তার কার্যক্ষমতা ফিরে পেতে পারে।